অপারেশন এপিক ফিউরি: মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের ‘বড় জুয়া’ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে বিশ্ব
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 03 Mar, 2026
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন আর কেবল ধোঁয়া নয়, উড়ছে এক অনিশ্চিত যুদ্ধের কালো মেঘ। গত শনিবার ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা—যা পেন্টাগন নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’—কয়েক দশকের পুরোনো শত্রুতাকে এক ধাক্কায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং ট্রাম্পের ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ’ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক কম্পন সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন এখন একটাই—ওয়াশিংটন কি পারবে এই ব্যয়বহুল যুদ্ধের শেষ টানতে, নাকি এটি আরেকটি অন্তহীন সংঘাতের সূচনা?
২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে ‘বড় যুদ্ধাভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেন। পেন্টাগন জানায়, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে ‘মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া’। হামলার প্রথম কয়েক ঘণ্টাতেই তেহরানে নিজ কার্যালয় কম্পাউন্ডে নিহত হন ইরানের দীর্ঘ চার দশকের শাসক আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ইরানের ১ হাজার ২৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে এবং ধ্বংস করা হয়েছে ১১টি ইরানি জাহাজ। অভিযানে বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান থেকে শুরু করে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
যুদ্ধের খতিয়ান: পকেট কাটছে মার্কিন করদাতাদের
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ২০২৫ সালের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৩শ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই ওয়াশিংটনের খরচ হয়েছে প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় প্রতিদিন ব্যয় হয় ৬৫ লাখ ডলার। স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবেল সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটকে ১.৫ ট্রিলিয়নে উন্নীত করার প্রস্তাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ট্রাম্প ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে ‘পূর্ণাঙ্গ দায়মুক্তি’র প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইআরজিসি কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, এটি ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতির গভীরে প্রোথিত এক আদর্শিক শক্তি। খামেনির মৃত্যুতে এই বাহিনী ভেঙে পড়ার বদলে বরং রাষ্ট্রের ওপর তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হতে পারে বলে মনে করছেন আটলান্টিক কাউন্সিলের পরিচালক জোনাথন প্যানিকঅফ।
নেপথ্যে কি সৌদি যুবরাজ?
ওয়াশিংটন পোস্টের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই হামলার পেছনে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের জোরালো লবিং কাজ করেছে।
যদিও জনসমক্ষে সৌদি আরব কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছে, কিন্তু গোপনে যুবরাজ ট্রাম্পকে জানিয়েছেন যে, এখনই ইরানকে না থামালে ভবিষ্যতে তারা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। তবে এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে, যা দুবাইয়ের মতো বাণিজ্যিক শহরগুলোকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
দুবাইয়ে আতঙ্ক: ধনকুবেরদের পলায়ন
ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে দুবাই এখন উৎকণ্ঠার শহর। বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে ওমান বা রিয়াদে পালিয়ে যেতে মরিয়া ধনীরা।
ফলে ব্যক্তিগত বিমানের (প্রাইভেট জেট) ভাড়া আকাশ ছুঁয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে যে রুটের ভাড়া ছিল ৩০ হাজার ইউরো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার থেকে ৯৫ হাজার ইউরোতে। এমনকি বিমা জটিলতায় অনেক কোম্পানি ফ্লাইট পরিচালনা করতেও অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
আইনি বিতর্ক: এটি কি ‘খুন’ নাকি ‘যুদ্ধ’?
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে খামেনি হত্যার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো সার্বভৌম দেশের নেতাকে এভাবে হত্যা করা বিরল।
ট্রাম্প প্রশাসন একে ‘আসন্ন হুমকি’ মোকাবিলার আত্মরক্ষা হিসেবে দাবি করলেও সমালোচকদের মতে, কংগ্রেস বা জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। এই যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব তেলের বাজার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটে ফেলে দেবে বলে মনে করেন বিশ্লষকরা।।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

